সিলেট বিভাগের ছোট-বড় সকল হাওর এ কদিনের অতিবৃষ্টির পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে কৃষকের পাকা ধান! স্বপ্ন! কী পরিমাণ ধান কাটা হলো—এর প্রকৃত তথ্য কৃষক ছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, দপ্তর-পরিদপ্তর কেউই জানে না। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তো মনগড়া হিসাব দেয়, কথা বলে, যা শুনতেও অরুচি হয়। একটা স্বাধীন দেশের চাকর-বাকরেরা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতন নেন তাঁদের নিজেদের হক বা পাওনা মনে করে, কিন্তু তাঁদের কর্তব্যজ্ঞান বিবেকবর্জিত এবং নির্লজ্জ অবস্থায় পৌঁছেছে—সে বোধটুকুও যেন হারিয়ে গেছে!
বোরো ধান কাটা মৌসুম আসার শুরু থেকেই (রোজার ঈদের ২ দিন আগে থেকে) মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনসহ হাওরের সাথে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে ফসলের সুরক্ষা নিয়ে একাধিকবার কথা হয়েছে। কে শোনে কার কথা? আর আমলা-কামলারা কথা শুনবেই বা কেন—যে দেশের রাজনীতিবিদেরাই জনস্বার্থের উন্নয়নের চেয়ে অগ্রাধিকার দেয় লুটেরা উন্নয়নকে? আচ্ছা, একটা দেশের আবহাওয়া, জলবায়ু, পরিবেশ এবং ভূপ্রকৃতির গঠন কাঠামোর ওপর ন্যূনতম জ্ঞান না রাখলে কি উন্নয়নের রাজনীতি জুতসই হয় বা হবে?

হাওরের বড় দাগের উন্নয়ন মানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ অথবা ফসল রক্ষা বাঁধ। এর বাইরে কোনো ভাবনা তো দেখি না। বোরো ধানের ফসলের সুরক্ষা নিয়ে উপরোক্ত ভাবনায় সুরক্ষার চেয়ে বছর বছর সরকারি অর্থ লুটের মানসিকতা বেশি কাজ করে। একটা প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট আমলা-কামলা থেকে শুরু করে কে না পায় এই লুটের ভাগটা? এখানে, এ দেশের পরিবেশে কৃষিজ উৎপাদনের ইতিহাসটাই আদিম (Primitive)। তখনও, সেই সনাতনী ও আদিম যুগে মানুষ ফসল ফলাত পরিবেশের সাথে সমন্বয় সাধন করে। বুঝতে হবে এর ধারাবাহিকতাই কেবলমাত্র বহন করছি আমরা। ইতিমধ্যে কৃষিতে যুক্ত হয়েছে টেকনোলজি। টেকনোলজির তোড়ে আমরা নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে কিছু সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানও হারিয়ে ফেলেছি। বিষয়টি পরিষ্কার করতে একটা উদাহরণ দিয়ে বলছি। ১৯৭৬ সালে (মনু ও কুশিয়ারা নদীতে বাঁধ দিয়ে ‘মনু সেচ প্রকল্প’ তখনও হয়নি) চৈত্র মাসের অতিবৃষ্টিতে কাউয়াদিঘি হাওরের বোরো ফসল উজানের ঢলে তলিয়ে যায়। থৈ থৈ পানিতে ভাসতে থাকে হাওর। কৃষক বাবা-চাচার ফসল হারানোর বেদনাভরা বিষণ্ন মুখ, মাথায় হাত—এ যেন প্রকৃতির বিরুদ্ধে ঈশ্বরের কাছে বিরাট আর্তনাদ! সবাই যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়! একই সময়ে উজান এলাকার আত্মীয়স্বজন এসে বাঁশ দিয়ে ‘মুরন’ বানিয়ে (এক ধরনের বাঁশের তৈরি চিরুনির মতো প্রযুক্তি) পানির তল থেকে প্যাঁচিয়ে প্যাঁচিয়ে ধান সংগ্রহ করে নৌকায় ভরে বাড়ি নিয়ে আসতে থাকেন। এতে করে নষ্ট ও অপচয় বাদ দিলেও ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ধান সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল। এমন স্বেচ্ছাশ্রমে ছিল পারস্পরিক সহমর্মিতা, আন্তরিকতা। রাষ্ট্র ও শাসকগোষ্ঠীর লুটেরা চরিত্রের কারণে আমাদের সমাজের মানবিক ভ্রাতৃত্বের বোধ, বিপদে পরস্পরের পাশে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষাও আজ ধ্বংসপ্রায়!
অদক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে থাকা টেকনোলজি আমাদের কাণ্ডজ্ঞান কেড়ে নিয়েছে। টেকনোলজি এখন আমাদের চিন্তাকে একপেশে করে দিয়েছে। আমরা এখানের পরিবেশ-প্রতিবেশ বিবেচনায় রাখি না। ক্ষতির পরিমাণ নির্মূলের চিন্তা মাথায় ঘুরঘুর করে। সর্বোচ্চ মুনাফা আমাদের মগজকে গ্রাস করে ফেলছে। দরকারে অথবা অদরকারে কৃষিতে টেকনোলজির প্রয়োগের কারণে হাওরাঞ্চলে না আছে আগের মতো পর্যাপ্ত নৌকা, না আছে শ্রমিক, না আছে সরকারের কৃষি ও কৃষকবান্ধব কর্মসূচির আন্তরিক প্রয়োগ। এটি যে ভাটির দেশ, এ যেন আমরা কয়েক দশক আগেই বেমালুম ভুলে গেছি। যে কারণে লাগসই প্রযুক্তিও হারিয়ে গেছে। হারিয়েছি নদীপথে যাতায়াতের সকল সুযোগ-সুবিধা।
জেলা প্রশাসন, পাউবো, পিডিবি, কৃষি বিভাগ ও সরকার বাংলাদেশের বোরো ধান উৎপাদনের দ্বিতীয় বৃহত্তম ‘মনু সেচ প্রকল্প’-এর কাউয়াদিঘি হাওরে ঢলের পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান সংগ্রহে এবং ইতিমধ্যে কৃষকের সংগ্রহকৃত ধান পচে যাওয়া থেকে বাঁচানোর নিম্নরূপ উদ্যোগ জরুরি ভিত্তিতে গ্রহণ করতে পারেন:
১. মনু সেচ প্রকল্প একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। কুশিয়ারা নদীর পানি পরিমিত থাকলে এ প্রকল্পের কাশেমপুর পাম্প হাউসের ০৮টি পাম্প একসাথে চালু করলে ভরা কাউয়াদিঘি হাওরও ৪৮ ঘণ্টায় শুকিয়ে ফেলা সম্ভব। পাম্প সচল রাখতে প্রয়োজনীয় ০৩ (তিন) মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিড থেকেই সরবরাহ করা সমীচীন। বিদ্যুৎ ঘাটতির যুক্তি দেখিয়ে কোনো অবস্থাতেই জেলার ভাগের হিস্যা নামের শুভঙ্করের ফাঁক বা বিদ্যুৎ ভাগাভাগিতে পাম্প হাউস অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।
২. জেলা প্রশাসন তড়িৎ গতিতে চা-বাগান মালিক-ম্যানেজারদের সাথে সমন্বয় করে চা-বাগানের পার্ট-টাইম শ্রমিক ও কর্মহীন শ্রমিকদের হাওরে ডেপুট করতে পারেন।
৩. রোদের আলো না থাকায় ইতিমধ্যে কৃষকের সংগ্রহকৃত বোরো ধানের স্তূপ কৃষকের বাড়ির ঘরে, আঙিনায় এবং রাস্তায় পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। জেলার সবকটি অটো রাইস মিল মালিকদের নির্দেশ প্রদান করে এই ধান দ্রুততার সাথে চালে রূপান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচিতে ভাটি অঞ্চলের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে আধুনিক মানের ধান সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি।
পরিশেষে, কৃষকের সন্তান হিসেবে একটা অভিজ্ঞতার কথা বলে লেখাটা শেষ করতে চাই। এই যে সংগ্রহকৃত ধান পচে গেল—এজন্য এককথায় দায়ী হলো কৃষি ও কৃষকবিমুখ জাতীয় অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের গণবিমুখ আমলাতান্ত্রিক চরিত্র। আমরা জানি, মৌলভীবাজার জেলায় আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর পানিতে ভেজা ধান শুকানোর মতো সরকারি কোনো ব্যবস্থা নেই। এটি একটি প্রধান সমস্যা, কিন্তু প্রকৃত সমস্যা নয়। প্রকৃত সমস্যা হচ্ছে গরিব কৃষক-শ্রমিকের প্রতি ব্রিটিশ লিগ্যাসির আমলাতন্ত্র ও লুটেরা চরিত্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়-দরদের অভাব। মৌলভীবাজার জেলায় যতগুলো পোল্ট্রি ফার্ম আছে, তার একটি তালিকা আছে প্রশাসনের হাতে। আমার জানামতে, ওই ফার্মগুলোর খালি শেডে (মুরগি রাখার বড় ঘর) ১ লাখ মেট্রিক টন ধান শুকানো কোনো ব্যাপারই ছিল না।
দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রে কাজ করা আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরিত্রে পরিবর্তন না আসলে জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।
লেখক: এম. খছরু চৌধুরী
সদস্যসচিব, হাওর রক্ষা আন্দোলন
মৌলভীবাজার।।

